৪৬ বছরে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি

1502940030
দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আশংকাজনক হারে বেড়েছে। আমদানি ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) যে পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার পর তা কখনো হয়নি। অপরদিকে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির গতিধারাতে সাধারণত: আমদানি ব্যয় বাড়লে রপ্তানি আয়ও বাড়ে। কারণ বিদেশ থেকে যেসব কাঁচামাল আমদানি   করা হয় তার একটি অংশ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি হয়। অতীতে এমন হয়ে আসলেও এবার ব্যাতিক্রম। আশংকা করা হচ্ছে আমদানির নামে ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে রপ্তানি আয়েও কাঙ্খিত গতি আসেনি। বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে আয় করেছে তিন হাজার ৮৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র এক দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত দেড় দশকে এত কম প্রবৃদ্ধি হয়নি।
একই সময়ে আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের ছিল তিন হাজার ৯৯০ কোটি ডলার। সে হিসেবে গত এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ শতাংশ।
এদিকে, বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ধারাবাহিক কমছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আবার আমদানিজনিত চাপে দেশের ভেতরে বেড়েছে ডলারের চাহিদা। ফলে চাহিদার তুলনায় ডলারের যোগান কমে গেছে। এ কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন ঘটছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় এক টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ২ টাকা।  বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বর্তমানে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা ৭০ পয়সায়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রেমিট্যান্স আরো কমলে ডলারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন আরো বাড়বে। এতে রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ পড়বে আরো বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবেও দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬২৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সে হিসেবে একবছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩১৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৫০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এদিকে চলতি হিসাবে গত অর্থবছর ১৪৮ কোটি ডলার ঘাটতি হয়েছে। অথচ আগের অর্থবছর শেষে ৩৭০ কোটি ৬০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।
এদিকে, আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কারণে দেশের অর্থ পাঁচার হয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। তারা বলছেন, প্রকৃত আমদানি বাড়লে অর্থনীতিতে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা নেই।  কিন্তু আমদানির নামে অর্থ যদি পাচার হয় তাহলে ফল নেতিবাচক হবে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উত্স রেমিট্যান্স। কিন্তু গত অর্থবছর জুড়েই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী ধারায় ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে সাড়ে ১৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা এক হাজার ২৭৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের রপ্তানি ও আমদানির ধারা দেখলে দেখা যায় এ দুটির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য হচ্ছে না। আমদানির ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতির বাইরে পেট্রোলিয়াম, খাদ্য পণ্য প্রভৃতি অনেক বেশি আমদানি হচ্ছে। বিনিয়োগেও শ্লথ অবস্থা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে যেভাবে মূল্যপতন হচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রে সেভাবে হচ্ছে না। এতে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আমদানি-রপ্তানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে কিনা সে বিষয়টা খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে।
উল্লেখ্য, রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় যেটুকু বেশি, তার পার্থক্যই বাণিজ্য ঘাটতি। আর চলতি হিসাবের মাধ্যমে দেশের নিয়মিত বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বোঝানো হয়। আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য নিয়মিত আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।
Pin It