সংযোগ দেওয়া বন্ধ, অথচ তিতাসে গ্রাহক বেড়েছে ৭ লাখ

আবাসিকে নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকলেও তিতাসের গ্রাহক এক বছরে বেড়ে গেছে ৭ লাখের বেশি।

Titas+Gas

গ্রাহক সংখ্যা এক লাফে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডাটাবেইজে হালনাগাদকে কারণ দেখিয়েছেন তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মশিউর রহমান।

কিন্তু তিতাসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সংযোগ দেওয়াসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ বাংলাদেশ ভোক্তা অধিকার সমিতির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।

বাংলাদেশে উত্তোলিত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে যে ছয়টি সরকারি কোম্পানি বিক্রি করে, তার মধ্যে তিতাসই বিক্রি করে প্রায় ৬০ শতাংশ। ঢাকাসহ ১২টি জেলায় গ্যাস বিক্রির দায়িত্ব তিতাসের।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে জুন পর্যন্ত তাদের আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৬০১৩। ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৭ লাখ ১৭ হাজার ৫৩৬।

অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে গ্রাহক বেড়েছে ৭ লাখ ১১ হাজার ৫২৩।

গত কয়েক বছর ধরেই আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। পেট্রোবাংলা ও তিতাসের দুজন কর্মকর্তা বলেছেন, আবাসিক সংযোগ বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে।

শুধু ‘প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুই লাখ আবাসিক গ্যাস মিটার স্থাপনের কাজ চলছে।

তাহলে এক বছরের ব্যবধানে কীভাবে এত সংযোগ বেড়ে গেল?

উত্তরে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মশিউর রহমান বলেন, “তথ্যে এক ধরনের অসঙ্গতি ছিল, সেটা হালনাগাদ করা হয়েছে।”

কী ধরনের অসঙ্গতি ছিল- সে ব্যাখ্যায় কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোম্পানির আইটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এ আধুনিকায়নের আওতায় কোম্পানির আবাসিক গ্রাহকদের ডাটাবেইজসহ লেজার সিস্টেম হালনাগাদ করা হয়।”

এই ‘হালনাগাদের ফলে’ গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

ভোক্তা অধিকার সমিতির জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, “এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।”

তিনি প্রশ্ন করেন, “আইটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করলে গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে যাবে, আর তা ম্যানুয়ালি থাকলে গ্রাহক সংখ্যা কম থাকবে, এটা কোনোভাবে হতে পারে?”

এ ধরনের তথ্য দেওয়াটা এক ধরনের ‘ম্যানিপুলেশন’ (তথ্য জালিয়াতি) বলে মন্তব্য করেন শামসুল আলম।

  তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যে গ্রাহক সংখ্যায় উল্লম্ফনগ্যাস বিক্রয়কারী সর্ববৃহৎ সরকারি কোম্পানিটির অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধানও করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৭ হাজার ১৮ মিলিয়ন ঘন মিটার গ্যাস বিক্রি করেছে; যার মূল্য ১২ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। এ থেকে প্রকৃত মুনাফা হয়েছে ৫০৬ কোটি টাকা।

প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বাজার মূলধনের এ কোম্পানিতে জনবল রয়েছে তিন হাজার ৭১৯ জন।

আর্থিক প্রতিবেদনে তিতাস থেকে ‘অবৈধভাবে’ আবাসিক সংযোগ নেওয়া ও গ্যাস চুরির তথ্যও উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭২টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস কারচুপি/অবৈধ সংযোগের কারণে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৪২টি আবাসিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

আবাসিকে অবৈধ সংযোগ বৈধ করার জন্য ২০১৩ সালের জুনের মধ্যে আবেদন করতে সুযোগ দেওয়া হয়। সেই সুযোগের চার বছর পরও অবৈধ সংযোগ বৈধ করার প্রক্রিয়া চলমান।

তিতাসের হিসাবে, ২০১৬-১৭ বছরে দুই হাজার ২৩৬টি আবেদনের বিপরীতে বৈধ করা হয়েছে ছয় হাজার ১৬০টি চুলা। সুযোগ দেওয়ার পর ২৪ হাজার সাতটি আবেদনের বিপরীতে মোট ৭৮ হাজার ২৪৭টি চুলা বৈধ করা হয়েছে।

তবে সাত লাখ গ্রাহক বেড়ে যাওয়াকে ‘অবৈধ সংযোগ’ বলে মানছেন না তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

হিসাবের বাইরে এই গ্রাহকরা কীভাবে লুকিয়ে ছিলেন তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “তিতাসের ২৬টা জোনাল অফিস। সবগুলো অফিসের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব ছিল।”

তিতাসের পক্ষ থেকে এসব যুক্তি মানতে নারাজ পেট্রোবাংলার সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তাও।

তিনি বলেন, “সাত লাখ গ্রাহকের তথ্য এতদিন হিসাবে ছিল না- এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।”

তিতাসের পরিচালনা পর্ষদ ‘অস্বাভাবিক এ তথ্যকে’ কীভাবে মেনে নিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এ তথ্য সম্বলিত বার্ষিক প্রতিবেদনটি গত ২১ ডিসেম্বর কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় পাস হয়েছে।

তিতাস পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জ্বালানি সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীর কাছে সাত লাখ গ্রাহক বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

সাত লাখ গ্রাহক বৃদ্ধির বিষয়টি তা নজরে এসেছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনি তিতাসের এমডির সঙ্গে কথা বলেন।”

Pin It