শীর্ষ ঋণখেলাপির ৪০% বস্ত্র ও পোশাক খাতের

base_1500232691-4

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই সৃষ্টি করেছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এর প্রতিফলন রয়েছে সম্প্রতি সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায়ও। তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ৪০ শতাংশের মতো বস্ত্র ও পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান।

দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় লুটপাটের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে সোনালী ব্যাংকে হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। শুধু সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার জন্যই বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের অন্তত ২৫টি ভুয়া কোম্পানি খোলে গ্রুপটি। হল-মার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সোনালী ব্যাংক ঋণ দিয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ খেলাপির তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে হল-মার্ক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স স্পিনিং মিলস লিমিটেডের নাম। শুধু এ প্রতিষ্ঠানটির কাছেই সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের মধ্যে রয়েছে টি অ্যান্ড ব্রাদার গ্রুপের নাম। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের এ গ্রুপটির চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ৬৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে ব্যাংকটির। এর মধ্যে টি অ্যান্ড ব্রাদার নিট কম্পোজিট লিমিটেডকে দেয়া ৩৭৬ কোটি ৫৫ লাখ, ড্রেস মি ফ্যাশনস লিমিটেডকে ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ, এক্সপোর্ট টেক লিমিটেডকে ১৭৫ কোটি ৬৬ লাখ ও লিনস অ্যাকসেসরিজকে দেয়া ১৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ঋণ এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে।

লুটপাটের শিকার বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় নাম রয়েছে প্রোফিউশন টেক্সটাইল লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বেসিক ব্যাংকের পাওনা ১১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায়ও প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে ৬০ নম্বরে।

শীর্ষ ১০০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ১৬ নম্বরে রয়েছে শাহারিশ কম্পোজিট টাওয়েল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি জনতা ব্যাংক থেকে ৩১৩ কোটি টাকা নিয়ে পরিশোধ করেছে মাত্র ৪ লাখ। আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড যমুনা, জনতা ও প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ২৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক পয়সাও পরিশোধ করেনি।

খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকা ওয়ান ডেনিম মিলস লিমিটেড ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, ডিবিবিএল, ইস্টার্ন, জনতা ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে মোট ১৭৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে, যার পুরোটাই খেলাপ হয়েছে। ওয়াল-মার্ট ফ্যাশন লিমিটেড সোনালী ব্যাংকের ১৭০ কোটি ৩ লাখ, এমবিএ গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড জনতা ব্যাংকের ১৬৯ কোটি ৪ লাখ, হিন্দুল ওয়ালি টেক্সটাইল লিমিটেড জনতার ১৫২ কোটি ৩ লাখ, দোয়েল অ্যাপারেলস লিমিটেড ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৪৩ কোটি ৫৯ লাখ, বিসমিল্লাহ টাওয়েলস লিমিটেড প্রাইম ব্যাংক থেকে ১৩৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা ঋণ নেয়ার পর এক টাকাও পরিশোধ করেনি। এছাড়া আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস লিমিটেড প্রাইম ব্যাংকের কাছ থেকে ১৩১ কোটি ৪ লাখ, নিউ রাখি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড সোনালীর কাছ থেকে ১৩২ কোটি, মাকসুদা স্পিনিং মিল ডাচ্-বাংলা থেকে ১১৯ কোটি ৯৫ লাখ, বিসমিল্লাহ টাওয়েলস লিমিটেড শাহজালাল থেকে ১০৯ কোটি ৬৭ লাখ, মাহবুব স্পিনিং সাউথইস্ট থেকে ১০৮ কোটি ৭ লাখ, সর্দার অ্যাপারেলস লিমিটেড অগ্রণী থেকে ১০৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেনি। শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও ঠাঁই পেয়েছে।

এ বিষয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক চেয়ারম্যান এ. কে. আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসা করতে গিয়ে যে কেউ সত্যিকার অর্থেই ঋণখেলাপি হয়ে যেতে পারে। অর্ডার বাতিল হওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ, প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক কারণে কোনো কোনো ব্যবসায়ীর ব্যবসায় সমস্যা হতে পারে। সাধারণত ছোট ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে এমনটি হয়। কিন্তু বড় খেলাপিরা সাধারণত ঋণের অর্থ ডাইভার্ট করে ফেলেন। ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ধরনের ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হয়ে যান। পরে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, কোন প্রকল্পে ঋণ দিলে খেলাপি হয়ে যাবে, ব্যাংকাররা তা জানেন। তার পরও যদি রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো কারণে ঋণ দেয়া হয়, তাহলে ওই ঋণ খেলাপি হতে বাধ্য। এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। তবে যেসব গ্রাহক অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঋণখেলাপি হয়ে যান, তাদের পাশে সরকার ও ব্যাংকগুলোর দাঁড়ানো উচিত। সব উদ্যোক্তার দক্ষতা সমান নয়। অদক্ষ উদ্যোক্তা সব খাতেই থাকতে পারেন।

শীর্ষ খেলাপির তালিকায় থাকা কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেডে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৩৩ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি। এছাড়া শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় থাকা বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বেনেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আনোয়ার স্পিনিংস মিলস, মুন্নু ফ্যাব্রিকস লিমিটেড, চৌধুরী নিটওয়্যারস লিমিটেড, ফেয়ার ট্রেড ফ্যাব্রিকস লিমিটেড, রানকা শোল কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, রানকা ডেনিম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, বিশ্বাস গার্মেন্টস লিমিটেড, আশিক কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, এইচআর স্পিনিং মিলস (প্রা.) লিমিটেড, এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিলস লিমিটেড, দি ওয়েল টেক্স লিমিটেড, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বিশ্বাস টেক্সটাইলস লিমিটেড, ডি. আফরোজ সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মোবারক আলি স্পিনিং মিলস লিমিটেড ও ফেয়ার এক্সপো উইভিং মিলস লিমিটেড।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেন, আমাদের দেশে শিল্প বলতে এখনো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতকেই বোঝানো হয়। শিল্পে বিনিয়োগের ৬০ শতাংশই এ খাতে। ইস্পাত, সিমেন্টসহ ভারী শিল্পে বিনিয়োগ আমাদের দেশে খুবই কম। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে শুরুতে যেসব উদ্যোক্তা এসেছিলেন, তারা খুবই ভালো করেছেন। বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে দ্রুততম সময়ে রিটার্ন আসা শুরু হয়। দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় তাই অনেকেই এ খাতে বিনিয়োগ করেন। তবে না বুঝে ঝোঁকের বশে যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারাই বিপদে পড়েছেন। এদের অনেকেই এখন ব্যবসা করতে পারছেন না।

Pin It