বন্যায় গো-চারণভূমি ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট

base_1500232924-Kurigram-Flood-Situation-photo-(1)-16.07.17

বন্যা উপদ্রুত জেলাগুলোয় গো-চারণভূমি ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্য সংকট ও দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকায় গবাদিপশুর রোগবালাইয়ের প্রকোপও বেড়েছে। বন্যায় সম্পদ ও জীবিকা হারানো দুস্থ মানুষ গরু-বাছুর বাঁচাতে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

গত প্রায় দুই সপ্তাহের বন্যায় সিরাজগঞ্জে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি ডুবে গেছে গো-চারণভূমি। কাঁচা ঘাস চাষের জমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রাণিসম্পদের জন্য খ্যাত জেলার শাহজাদপুরে দেখা দিয়েছে গো-খাদ্য সংকট।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় সাড়ে আট লাখ গরু রয়েছে। এর মধ্যে শাহজাদপুর উপজেলাতেই রয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার গরু। খড়, খৈল ভুসিসহ অন্যান্য খাদ্যের পাশাপাশি এই বিপুল সংখ্যক প্রধান খাদ্য হলো কাঁচা ঘাস। এজন্য এখানে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর গো-চারণভূমি; যেখানে আবাদ হয়ে থাকে কাঁচা ঘাস। কিন্ত বন্যায় গো-চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছেন এখানকার খামারিরা। আগে থেকে সংরক্ষণ করা খড়ও নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে বেড়ে গেছে গো-খাদ্যের দাম।

নিজের খামারের তার প্রায় ৩০০ গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শাহজাদপুর উপজেলার রেশমবাড়ির বাদশা ফকির। তিনি বলেন, কাঁচা ঘাস খেতে না পাওয়ায় গরুর দুধ উত্পাদন কমে গেছে। প্রাণিসম্পদের প্রধান খাদ্য ঘাস সংকটের কারণে বিপদে পড়েছেন কয়েক হাজার খামারি।

তিনি আরো বলেন, ১৫ দিন আগে ৫০ কেজির এক বস্তা গমের ভুসি ১ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। আগে ২৫ টাকা কেজিদরে বিক্রি হওয়া খৈল এখন বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকা কেজিদরে। ৫০০ টাকার খড় এখন ক্রয় করতে হচ্ছে ৮০০ টাকায়। বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনমতো খড় পাওয়া যাচ্ছে না।

জানা গেছে, বন্যার কারণে গো-খাদ্যের প্রতিটি আইটেমের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ সংকটও সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বেশি দামেও প্রয়োজনমতো গো-খাদ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

শাহজাদপুর উপজেলার তালগাছি বাজারের গো-খাদ্য ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, গত ১৫ দিনে গো-খাদ্যের সব আইটেমের দাম বেড়েছে। খেসারির ভুসি দুই সপ্তাহ আগে ৮০০ টাকা বস্তা (৩৫ কেজিতে বস্তা) বিক্রি হলেও এখন বেড়ে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় দেড় মাস ধরে বন্যায় গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ফসলি জমির পাশাপাশি গো-চারণভূমিও তলিয়ে গেছে। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন উপদ্রুত এলাকার মানুষ।

কৃষকরা বলছেন, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও গবাদিপশু রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। এছাড়া বন্যার্তদের মাঝে বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হলেও গো-খাদ্য মিলছে না। অনেক দিন ধরে খাদ্য সংকটে ও পানিবন্দি থাকায় গবাদিপশুর নানা রোগবালাই দেখা দিয়েছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপাড় এলাকার কৃষক আব্দুল আলীর পাঁচটি গরু রয়েছে। তিনি বলেন, জুনের প্রথম থেকে পানিবন্দি অবস্থায় আছি। নিজেরা কোনো রকমে বেঁচে থাকলেও গোয়ালের গরুগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়েছি।

তিনি বলেন, এলাকার সব গো-চারণভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গবাধিপশু এক স্থানে বন্দি হয়ে আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খাদ্য সংকট। ফলে গবাদিপশু দুর্বল ও রুগ্ণ হয়ে পড়ছে।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর এলাকার কৃষক হরেন্দ্র বিশ্বাস পড়েছেন আরো বিপাকে। তার গোয়ালঘরটিই পানিতে তলিয়ে আছে এক মাসের বেশি সময় ধরে। এক প্রতিবেশীর বাড়ির উঠানে রেখেছেন নিজের গৃহপালিত পশু। হরেন্দ্র বলেন, পশু রাখার ব্যবস্থা হলেও খাবার তো মিলছে না। অনেক সময় পুরো দিন উপোস অবস্থায় থাকছে পশুগুলো। এখন কৃষকরা শুধু কচুরিপানা খাইয়ে গরু-বাছুর বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট উপজেলার কৃষকরাও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। অনেকে অল্প দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

গতকাল সিলেট-বিয়ানীবাজার সড়কে দেখা যায়, সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে গরু বেঁধে রেখেছেন এলাকার কৃষকরা। এসব গরুকে সড়কের পার্শ্ববর্তী প্লাবিত এলাকা থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে এনে খাওয়ানো হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের নাজিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সৈয়দ এনামুল হক বলেন, গো-খাদ্যের সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছে। দু-একটি গরু মারাও যাচ্ছে। হাওড়পাড়ে প্রায় সবাই গরু লালন-পালন করেন। বন্যায় ধান নষ্ট হলে খড়ও নষ্ট হয়ে যায়।

গত মার্চ-এপ্রিলের অকাল বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় ধানের সঙ্গে গো-খাদ্য হিসেবে খড়ও হারিয়েছিলেন কৃষকরা। এবার আউশ ধানও তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে। ফলে আউশ থেকেও খড় পাওয়ার সুযোগ কমছে। এতে গো-খাদ্যের সংকট আরো তীব্র হবে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।

Pin It