প্রচারণায় কেউ হেনস্তার শিকার হলে দায় ইসির: সিইসি

base_1500232807-2

নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ হেনস্তার শিকার হলে এর দায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ বাধা দিলে, নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে কমিশন তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসির রোডম্যাপ উন্মোচন উপলক্ষে গতকাল এসব কথা বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা।

নতুন নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্ব নেয়ার পাঁচ মাসের মাথায় এ রোডম্যাপ ঘোষণা করল ইসি। আইনি কাঠামো সংস্কার, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণসহ সাতটি বিষয় প্রাধান্য দিয়ে এ রোডম্যাপ সাজানো হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উন্মোচিত রোডম্যাপটি বাস্তবায়নে ইসির হাতে সময় রয়েছে এখনো দেড় বছর। রোডম্যাপটিতে নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক বিষয়াদি উল্লেখ করার পাশাপাশি এগুলো কখন কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তারও একটি রূপরেখা দেয়া রয়েছে।

রোডম্যাপ উন্মোচন উপলক্ষে গতকাল নির্বাচন কমিশনের ইটিআই ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিইসি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে দেশী-বিদেশী প্রভাবের বাইরে থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সিইসি। এ সময় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা যাবে বলে অভিমত দেন তিনি। এছাড়া ইভিএমে ভোটগ্রহণের দরজা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি বলেও মন্তব্য করেন সিইসি।

সম্প্রতি একজন রাজনীতিবিদের বাসায় কয়েকটি দলের নেতাদের ঘরোয়া বৈঠকে পুলিশের বাধাদানের বিষয়টি উল্লেখ করে সিইসির কাছে জানতে চাওয়া হয়, এমন পরিস্থিতি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সহায়ক পরিবেশ কিনা। জবাবে সিইসি বলেন, ‘কয়েকজন রাজনীতিবিদের ঘরোয়া মিটিংয়ে পুলিশের বাধা দেয়ার বিষয়টি আমাদের দেখার বিষয় নয়। এটা সরকারের বিষয়। এ মুহূর্তে এটি দেখা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। এখন সরকারের কাছে কোনো অনুরোধ থাকবে না। তবে তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে অনুরোধ করা হবে।’

ইসির এমন বক্তব্য দায় এড়ানো কিনা— এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমাদের ওপর আরোপিত দায়িত্বের প্রতি আমরা আনুগত্যশীল। আমাদের দায় কি, তা আইন দ্বারা নির্ধারিত। আমরা সে পথেই হাঁটব। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, রাজনৈতিক দল, দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে সমান সুযোগ করে দেয়া, আমরা তা করব। আইনের ভিত্তিতে আমাদের দেয়া ক্ষমতার সর্বাত্মক প্রয়োগের মাধ্যমেই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা বিধান করব আমরা।’

এ সময় অন্য আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু সরকার কেন? যেকোনো রাজনৈতিক দল এবং দেশী-বিদেশী প্রভাব এলেও আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারব বলে আমাদের আস্থা আছে।’

সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কতটুকু সম্ভব— সে বিষয়ে জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারব। তবে এখন সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর হস্তক্ষেপ করার আইনগত অধিকার নেই। তফসিল ঘোষণার পরই প্রশাসন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হবে।’

বর্তমানে রাজনীতিতে সবাই সমান সুযোগ না পেলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাজ টেকনিক্যাল। তফসিল ঘোষণার পর কীভাবে প্রার্থীরা নমিনেশন সাবমিট করবে, প্রার্থীদের কী কী নিরাপত্তা দিতে হবে, ভোটাররা কীভাবে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবে— সে ব্যবস্থা করাই নির্বাচন কমিশনের কাজ। পল্টন ময়দান বা সোহরাওয়ার্দী মাঠে কে কীভাবে বক্তৃৃতা করবে, কে বক্তৃৃতা দিতে পারছে না— সেটা দেখা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, এখনই নির্বাচনের সময়সীমা সম্পর্কে বলা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে সংসদ না ভাঙলে সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে হবে।

নির্বাচনের সময়ে ইসি সহায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনে সক্ষম কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের সময়ে সরকার কাঠামো কীভাবে থাকবে, সে বিষয়ে সংবিধান ও আইনে বলা আছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সময়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকবে। তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচনের পরের ১৫ দিন প্রশাসনের সব স্তর, সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রশাসনে পদায়ন বা বদলির ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন নিতে হয়। এ হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারি।

তবে নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ হেনস্তার শিকার হলে এর দায় কার? এ প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, দায় ইসির। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ বাধা দিলে, নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। আরপিওর একটি অধ্যায়ে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ওই অধ্যায় অনুযায়ী প্রটেকশন দেয়া আমাদের দায়িত্ব।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘আমরা ইভিএমে ভোটগ্রহণের দরজা বন্ধ করিনি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে ইভিএম নিয়ে আলোচনা করব। ২০১০-১১ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। ভুল-ত্রুটির কারণে এটি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের কাছে বুয়েটের তৈরি ৭০০-৮০০টি ইভিএম রয়েছে, যা পাঁচ-ছয় বছর পুরনো। এখন প্রযুক্তিরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আবার ইভিএম নিয়ে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিতর্ক রয়েছে। আগামী নির্বাচনে বুথের সংখ্যা হবে আড়াই লাখ ও ভোটকেন্দ্র হবে ৪০ হাজার। ওই সময়ের মধ্যে এতগুলো ইভিএম তৈরি করা যে অসম্ভব, তা নয়। তাই কমিশন স্কোপ রেখেছে। আমরা রাজনৈতিক দলের পরিকল্পনা দেখব, আমাদের আড়াই লাখ মেশিন কেনা ও সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের সক্ষমতা আছে কিনা, তা দেখব। এছাড়া সরকারও কতটুকু সহায়তা দেয়, সেটিও দেখার বিষয় রয়েছে।

এর আগে রোডম্যাপ উন্মোচনকালে সিইসি বলেন, ‘এটি একটি সূচনা দলিল। নির্বাচনের পথে কাজের জন্য এ কর্মপরিকল্পনাই সব নয়। সংশোধন-পরিমার্জন করে সবার মতামত নিয়ে আমরা কাজ করে যাব।’

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম স্বাগত বক্তব্যে জানান, নতুন নির্বাচন কমিশনারদের মেয়াদ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সব কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে করা হয়েছে। আজকের কর্মপরিকল্পনা কমিশনের কাজের ফসল। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা ধরেই এগোচ্ছি। জনগণের সামনে সুষ্ঠু ও সুন্দর, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চাই আমরা। আমরা যাতে সততা ও শক্তির স্বাক্ষর রাখতে পারি, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই।’

ইসির রোডম্যাপে যা আছে—

ইসির নতুন রোডম্যাগে সাতটি করণীয় বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো— আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সরবরাহ, বিধিবিধান অনুসরণপূর্বক ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ। প্রসঙ্গত, সাংবিধানিকভাবেই ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ইসির রোডম্যাপে দেখা গেছে, আইন সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চলতি মাসের ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংলাপ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর পর আগস্টে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবে ইসি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ চলবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে। অক্টোবরে নির্বাচন পর্যবেক্ষক, নারী নেতা ও নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। নভেম্বরে সংলাপের সুপারিশমালার প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করে ডিসেম্বর মাসে তা চূড়ান্ত করবে ইসি সচিবালয়।

আইন সংস্কারের বিষয়ে রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান আইন ও বিধিমালায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনী আনয়নের মাধ্যমে তা আরো কার্যকর করে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। ক্ষেত্রবিশেষে মূল আইনি কাঠামোর আওতায় থেকেই কিছু প্রয়োজনীয় ধারণা চালু করার উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া আরো অর্থবহ ও সহজতর হয়।’

এতে আরো বলা হয়েছে, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ আইনে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। আইন সংস্কার করে শুধু জনসংখ্যাকে বিবেচনায় না এনে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও আয়তনকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। রাজধানীর মতো বড় শহরের আসন সংখ্যা সীমিত করে তা নির্দিষ্ট করে দেয়ারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রোডম্যাপে চলতি জুলাই থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইন সংস্কারের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোডম্যাপে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ বিষয়ে আরো বলা হয়েছে, জুলাই ও আগস্টে নির্বাচনী এলাকা পুনঃনির্ধারণের জন্য আগের নীতিমালা পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-২ একটি নতুন নীতিমালা প্রস্তুত করবে। আগস্টে নির্বাচনী এলাকা পুনঃনির্ধারণের জন্য জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমস (জিআইএস) সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অক্টোবর মাসে নীতিমালার আলোকে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৩০০টি আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে খসড়া তালিকা প্রণয়ন করা হবে। নভেম্বর মাসে নির্বাচনী এলাকার খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। এর ওপর কারো দাবি, আপত্তি ও সুপারিশ থাকলে তাও আহ্বান করা হবে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে এসব আপত্তির বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক শুনানি শেষে নিষ্পত্তি করা হবে। ডিসেম্বরে ৩০০টি আসনের সীমানা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।

এছাড়া নতুন দল নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত দলগুলোর নিবন্ধন শর্তের পরিপালন নিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলবে আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আগামী বছরের মার্চ মাসে নতুন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২৫ জুলাই থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু হয়ে তা চলবে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বাড়াতে চলতি মাস থেকেই ভোটগ্রহণ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

Pin It