রোহিঙ্গাদের রক্ষার প্রস্তাব জাতিসংঘে তুললেন হাসিনা

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্প ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তার হৃদয় আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত।শেখ হাসিনা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগত নিধন’ এখনি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন, শরণার্থীদের ফেরত নিয়ে তাদের সুরক্ষা দিয়ে পুনর্বাসনের কথা বলেছেন।

মুসলিম রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে ‘সেইফ জোন’ গঠনের প্রস্তাব বিশ্ব সংস্থায় তুলেছেন তিনি; বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবকে একটি অনুসন্ধানী দল পাঠাতে।

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানের কথাও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট করেন তিনি।

শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়, মানব কল্যাণ চাই।”

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যে জাতিসংঘের অধিবেশনে আট লাখ শরণার্থীর আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ছিলেন সবার মনোযোগের কেন্দ্রে।

মিয়ানমারের নির্যাতিত এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনার প্রশংসাও ঝরছে বিশ্বনেতাদের কণ্ঠে।

সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগেই জাতিসংঘে বিভিন্ন বৈঠক ও সভায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে তার প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি জোরের সঙ্গে বলেন,এই শরণার্থীদের মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবে।

এরপর বিশ্ব সংস্থার ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের সামনে বাংলায় দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনার প্রস্তাব

>> অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা

>> অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা

>> জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা

>> রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা

>> কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা

এই রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতেও মিয়ানমার সরকার রাজি না হলেও শরণার্থীদের যাচাই সাপেক্ষে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অং সান সু চি। আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাননি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর।

কয়েক যুগ ধরে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসছে বাংলাদেশ, যারা নিজ দেশ  মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের শিকার।

গত ২৫ অগাস্ট রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সেখানে শুরু হয় সেনা অভিযান; এরপর বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল।

শাহ পরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে নৌকায় উঠছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা রোহিঙ্গাদের এই মানবিক সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সমালোচনা করছে মিয়ানমার সরকারের।জাতিসংঘে চতুর্দশবার ভাষণ দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা শুরুতেই বলেন, “আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি।”

কয়েকদিন আগেই কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখে আসার কথা জানিয়ে তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “এদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি।

“১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে ৬ বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি।”

মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলেও রোহিঙ্গারা যে হাজার বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশটির রাখাইনে বসবাস করে আসছেন, বিশ্ব নেতাদের তা জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে।

“এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে।”

এই প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ঘটনা তুলে ধরে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনে বাংলাদেশের পদক্ষেপ জাতিসংঘে জানান তিনি।

“বিশ্বের কোথাও যাতে কখনই আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত না হয়, সেজন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি।”

মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ও জাতিসংঘের মহাসচিবকেও ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আমরা এই মুহূর্তে নিজ ভূখণ্ড হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত ৮ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি।”

উদ্বেগময় পরিস্থিতির বর্ণনা করে তিনি বলেন, “এ সব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন, এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে।”

একইসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। এ বিষয়ে আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’নীতি মেনে চলে।”

সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদকে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে নিজের বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

“আমরা ধর্মের নামে যে-কোনো সহিংস জঙ্গিবাদের নিন্দা জানাই। সহিংস জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি।”

বৈশ্বিক সন্ত্রাস মোকাবেলায় তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

>> সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে

>> সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে

>> শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্যও সব দেশের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে’ এক লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার উপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আরও নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘সার্কেল অব লিডারশিপ’র প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ বিষয়ে গঠিত ‘ভিকটিম সাপোর্ট তহবিলে’ এক লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণাও দেন শেখ হাসিনা।

তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচার, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার জগত থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

“এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আমি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কার্যকর পদক্ষেপ তুলে ধরতে গিয়ে বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সাফল্যের কথা বলেন তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা মনে করি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি।”

এসডিজি অর্জনের বাংলাদেশের অগ্রগতিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সাফল্যগাথাও বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

Pin It