নিরাপত্তার ব্যবস্থা না নিয়েই বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস

1510767947

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার। অনেকটা সাধারণ মুদি পণ্যের মতোই বিক্রি হচ্ছে এ জ্বালানি পণ্য। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সিলিন্ডার বিক্রির কারণে একদিকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে অন্যদিকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

গত রবিবার রাতে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার শান্তির বাজারে একটি কনফেকশনারিতে আগুন লাগে। সেটি পাশের দোকান লেখাপড়া টেলিকম অ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে বাজারের ১৩টি দোকান পুড়ে যায়। এতে কেউ হতাহত না হলেও প্রায় দুই কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। লেখাপড়া টেলিকম অ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোরটি মূলত একটি মোবাইল এবং মোবাইল এক্সেসরিজ পণ্যের দোকান। এ দোকানে রবিবার রাতে ৪২টি সিলিন্ডার ছিল বলে জানান, ওই দোকানের মালিক নূর উর রহমান সেলিম। এর জন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। কোনো লাইসেন্সও ছিল না তার। ১০টির বেশি সিলিন্ডার বিক্রির জন্য যে পৃথক লাইসেন্স দরকার হয় সেটিও জানেন না তিনি।

সরকার আবাসিক খাতে পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে এলপি গ্যাস ব্যবহারের পথে হাঁটছে। আগামী কয়েক বছরে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ বহুগুণ বাড়বে। এলপি গ্যাস আমদানিকারক ও বিক্রিকারী কোম্পানিগুলো জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ডিলারের মাধ্যমে সিলিন্ডর বিক্রি করছে। ডিলাররা আবার খুচরা দোকানে এগুলো বিক্রি করছে। খুচরা দোকানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০টির বেশি সিলিন্ডার থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। কেউ কেউ জেনেশুনে এটি মানছেন না, আবার অনেকেই এ সম্পর্কে জানেন না।

বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪’র ‘দ্য এলপি গ্যাস রুলস ২০০৪’-এর ৬৯ ধারার ২ বিধিতে বলা হয়েছে, ১০ (দশটি) গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদকরণে লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। এর বেশি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। একই বিধির ৭১ নং ধারায় বলা আছে, আগুন নেভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুত রাখতে হবে। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার। কিন্তু সিংহভাগের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নেই। ইত্তেফাকের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলার প্রতিনিধিরা জানান, উপজেলা পর্যায়ের সব বাজারেই লাইসেন্স ছাড়া সিলিন্ডার বিক্রিকারী অনেক দোকান রয়েছে। এলপি গ্যাস এক ধরনের দাহ্য পদার্থ। এ ধরনের পণ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ নকশা মেনে গুদামঘর তৈরি করতে হয়। তা না হলে সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। এ আইন অমান্য করলে যেকোনো ব্যবসায়ী অন্যূন দুই বছর এবং অনধিক পাঁচ বছরের জেল এবং অনধিক ৫০ হাজার টাকায় দণ্ডিত হবেন এবং অর্থ অনাদায়ী থাকলে অতিরিক্ত আরো ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মোঃ সামসুল আলম বলেন, ১০টির বেশি এলপি গ্যাসপূর্ণ গ্যাসাধার রাখলে যেকোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদ নিতে হবে। সনদ ছাড়া ব্যবসা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু দেশের অনেকস্থানেই এটি মানা হচ্ছে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা বা লাইসেন্স গ্রহণ না করা জননিরাপত্তা এবং বাজারনিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, অধিদপ্তরের জনবলের অভাব রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা তার ঊর্ধ্বতন যে কোনো কর্মকর্তা বাজার পরিদর্শন করে এ ব্যাপারে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। জেলা প্রশাসক এবং থানা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে বলা হয়েছে।

দেশে সাধারণত এলপি আমদানি বা উত্পাদনকারীর কারখানা থেকে ডিলার হয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার পৌঁছায়। এক্ষেত্রে উত্পাদনকারীরা ডিলারদের কাছে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদের বিষয়টি যাচাই করে থাকেন। কিন্তু এর পর এ প্রক্রিয়ায় সাধারণত আর কোনো তদারকি হয় না। এলপি গ্যাসের কয়েকজন খুচরা বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, লাইসেন্সের ব্যাপারটি কেউ খতিয়ে দেখে না তাই অর্থ খরচ করে তারা এটি গ্রহণ করতে আগ্রহবোধ করেন না। পাশাপাশি ডিলাররাও এক্ষেত্রে তাদের উত্সাহিত করেন না। বরং যে টাকা লাইসেন্স করতে খরচ করবেন সে টাকা খরচ করে সিলিন্ডার কিনতে উত্সাহিত করেন।

Pin It