ধানের উচ্চমূল্যে বন্ধ প্রায় অর্ধেক চালকল

base_1500232868-1

২০০৮ সালে চালু হওয়ার পর প্রতি বছরই সরকারকে চাল সরবরাহ করে আসছিল রংপুরের মাহিগঞ্জের মুক্তার সন্স অটো রাইস মিল। এবার আর তা ধরে রাখতে পারেনি মিল কর্তৃপক্ষ। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত মাসের মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যায় মিলটি। ঈদের আগে যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করলেও উচ্চমূল্যের কারণে ধান কিনতে পারেননি মিল মালিক। চালু করতে পারেননি মিলও। মিলটিতে গিয়ে দেখা যায়, অলস সময় পার করছেন আট-নয়জন স্থায়ী শ্রমিক। ধান না থাকায় কাজে যোগ দিতে পারছেন না অস্থায়ী আরো প্রায় ১৫০ শ্রমিক।

রংপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও জেলা চালকল মিল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় চালকল রয়েছে ৯০৫টি। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে চাল সরবরাহের চুক্তি করেছে মাত্র ৪১১টি চালকল। চুক্তির বাইরে থাকা সিংহভাগ মিলই উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের চাল সংগ্রহ কার্যক্রম। এ পর্যন্ত ৮ শতাংশ চালও সংগ্রহ করতে পারেনি জেলা খাদ্য অফিস।

রংপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. শাজাহান ভূঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ১৭ হাজার ৬৪৮ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এ বছর। এর বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৩৮ টন।

চালকল অধ্যুষিত নওগাঁ, বগুড়া, দিনাজপুর ও জয়পুরহাট ঘুরেও দেখা গেছে একই চিত্র। এসব জেলার চালকল মালিকরাও জানিয়েছেন ধানের উচ্চমূল্যের কথা। এই দামে ধান কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় চাল উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন প্রায় অর্ধেক মিল মালিক।

বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির তথ্যমতে, সারা দেশে সমিতির সদস্যভুক্ত চালকল রয়েছে ১৮ হাজার ৭০০টি। এর মধ্যে অটো রাইস মিলের সংখ্যা ৫০০, সেমি অটো ৭০০ ও হাসকিং মিল ১৭ হাজার ৫০০। সনদ নেয়া এসব মিলের মধ্যে প্রায় নয় হাজার বন্ধ রয়েছে। ৩০০টি অটো রাইস মিল ও ২০০টি সেমি অটো রাইস মিলও উৎপাদনে নেই।

দেশের অন্যতম চাল উৎপাদনকারী জেলা বগুড়ায় চালকল রয়েছে ১ হাজার ৯৩৫টি। এর মধ্যে অটো রাইস মিল ৩৬ ও সেমি অটো ২০০টি। বাকি ৬৯৯টি হাসকিং চালকল। এসব মিলের মধ্যে সরকারকে চাল সরবরাহের চুক্তি করেছে মাত্র ৭৩৫টি। এগুলোর সিংহভাগই ছোট চালকল। অটো রাইস মিলের সিংহভাগই রয়েছে চুক্তির বাইরে। জেলার অটো রাইস মিলগুলোর মধ্যে ১৬টি ধানস্বল্পতায় উৎপাদনে যায়নি। যেসব মিল চুক্তি করেছে, তাদেরও অনেকে চাল দেয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে ধানের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষক পর্যায়ে প্রায় সব ধানই বিক্রি হয়ে গেছে। গুটিকয় বড় কৃষক বাদ দিলে বীজ ধান ছাড়া কৃষক পর্যায়ে ধানের মজুদ সীমিত। ধানের বড় সংগ্রহ এখন মধ্যস্বত্বভোগী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে তারা সরকারের মজুদ পরিস্থিতি, আমদানি ও সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বেশি দামে বাজারে ধান ছাড়ছেন। বেশি দামে ধান কিনে চাল উৎপাদনের পর তা সরকারের কাছে বিক্রি করাকে লাভজনক মনে করছেন না মিলাররা। উৎপাদনে না গিয়ে মিল বন্ধ রাখাকেই শ্রেয় মনে করছেন তারা।

বিষয়টি স্বীকার করেন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির বগুড়া জেলার সভাপতি এটিএম আমিনূল হক। তিনি বলেন, ধানের অভাবে অটো মিল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ২৪ টাকা দরে ধান কেনা যাচ্ছে না। ওই দামে ধান কিনলে প্রতি মণের দাম পড়ে ৯৬০ টাকা। এর সঙ্গে উৎপাদন খরচ সর্বনিম্ন ৬০ টাকা যোগ করলেও দাম হয় ১ হাজার ২০ টাকা। প্রতি মণ ধানে চাল পাওয়া যায় ২৬-২৭ কেজি। ফলে মুনাফার মার্জিন ছাড়াই চাল উৎপাদন খরচ প্রায় ৩৮ টাকা। এ অবস্থায় মিল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মিলারা।

দেশে চালের বড় জোগানদাতা উত্তরবঙ্গের আরেক জেলা দিনাজপুর। জেলাটিতে চালকল রয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০টি। ১৭৫টি অটো রাইস মিলের মধ্যে সদর উপজেলার পুলাহাট, গোপালগঞ্জ, কাহারোল, বীরগঞ্জ ও বোচাগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৩০টি বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বেশকিছু মিল পরিপূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না। ধানের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না জেলার এক হাজারের বেশি হাসকিং মিলও।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যও বলছে, ধানের সরবরাহ ও দামের মধ্যে অসঙ্গতির কারণে চলতি বছর সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেনি সিংহভাগ চালকল। গত বছর বোরো মৌসুমে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ চালকল চুক্তি করলেও এবার করেছে মাত্র ৩২ শতাংশ।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি ও দিনাজপুরের পাটোয়ারী বিজনেস হাউজের পরিচালক সহিদুর রহমান পাটোয়ারী (মোহন) বলেন, চালকলগুলো না চালালে কিছুটা ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে মিলারদের। কিন্তু চালু রাখলে ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়েও বেশি। কেননা বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারদরের সঙ্গে চাল উৎপাদনের যুক্তিসঙ্গত খরচ যুক্ত করলে যে দাম হয়, তার চেয়ে চালের দাম কেজিপ্রতি কমপক্ষে ৪ টাকা কম নির্ধারণ করেছে সরকার। ধানের সঙ্গে চালের দামের এ অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রতি কেজি চালে ৪ টাকা লোকসান না করে মিল বন্ধ রাখাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন মিলাররা।

চালকলগুলো বন্ধের প্রকৃত কারণ কী, সে ব্যাপারে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মত দেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল। তিনি বলেন, মিলারদের বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চমহল থেকে কারসাজির অভিযোগ করা হয়েছে। যদি ধানের সরবরাহ না থাকার কারণে বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে বোরো মৌসুমে প্রকৃত ধানের উৎপাদন তথ্য প্রকাশ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ধান ও চালের দামের মধ্যে যুক্তিযুক্ত ব্যবধান করে পুনরায় দাম নির্ধারণ করে মিলগুলো চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আর মিলার যদি কারসাজি করে থাকেন, তাহলে কোথায় কীভাবে কারসাজি করছে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বোরো মৌসুমে সরকারকে চাল সরবরাহের চুক্তি করেছে মাত্র ৭ হাজার ২৮৪টি মিল। চুক্তির বাইরে থাকা চালকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ) মো. আতাউর রহমান। তিনি বলেন, সরকারকে চাল সরবরাহে যেসব মিল চুক্তি করেনি, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য খাদ্য অধিদপ্তরকে এরই মধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব মিলের সঙ্গে আগামী চার মৌসুম চাল কেনার কোনো চুক্তি করা হবে না।

Pin It