‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

PM_Sofia_DW_2_Samakal1_FB-5a2803ff4c8e2

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’ শুরু হয়েছে।  ৬ ডিসেম্বর বুধবার চারদিন ব্যাপী তথ্য প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে সামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে।

সুন্দর আগামীর জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলছি। কাজেই সমগ্র বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয় এবং আমি আশা করি এই তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির জনকের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করবে।

তথ্য প্রযুক্তি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের উন্নয়নের সবথেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের জিডিপিকে ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানিও আমাদের বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, আইসিটি সেক্টরটাকে যদি আমরা আরো সুযোগ দেই তাহলে এখান থেকেই আমাদের রপ্তানী আরো ব্যাপক হারে আসবে। আমাদের আর অন্য কোনদিকে তাকাতে হবে না এবং আমাদের ছেলে-মেয়েরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মেধাবী।

এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে সফটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফ্টওয়্যার ও আইসিটি সেবাখাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলায় হাইটেক বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে ১শ’ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তরা বিনিয়োগ করতে এলে এসব জায়গাতেও প্লট বরাদ্দ করা হবে।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফর্মেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তাফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য করেন।

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ছেলে-মেয়ে আমাদের শ্রমবাজারে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেরাও যেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে পারে সে ব্যাপারেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফ্টওয়্যার টেকনোলজী পার্ক। এর মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও যশোরে সফ্টওয়্যার পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি বেসরকারি সফ্টওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে। এসব পার্কে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ছেলে-মেয়েকে ঘরে বসে ট্রেনিং দেওয়া এবং বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে ১০টি ভাষায় অ্যাপ তৈরী করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লার্নিং এন্ড আর্নিং’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পোস্ট অফিস ডিজিটাল করে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে রয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। গ্রামে নিজের ঘরে বসে ছেলে-মেয়রা এখন বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করতে পারছে।

তিনি বলেন, এটাকে আরো উন্নত করে দেয়া হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রি ল্যান্সিং সাইট আপওয়ার্ক, ইল্যান্স এবং ফ্রি ল্যান্সারের প্রথম দশটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে আমাদের ফ্রি ল্যান্সাররা। বিশ্বে ফ্রি ল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। আমরা প্রথমস্থানে উঠবো ইনশাল্লাহ। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্য প্রযুক্তির পেশার সঙ্গে যুক্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বানানো শুরু করেছি। এই খাতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে চলতি বছর থেকে আমরা ৯৪টি উপকরণের ওপর শুল্ক প্রতীকী ১ শতাংশ করে দিয়েছি। ফলে কেবল দেশীয় উদ্যোক্তারা নয়, বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতারাও এখানে কারখানা তৈরিতে আগ্রহী হবে। ইতোমধ্যে স্যামসং-এর মত কোম্পানি ঢাকার অদূরে কারখানা স্থাপন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগকারীকে আমরা সর্বোতভাবে সহায়তা দেওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সংযোগ ও বেসরকারি খাতে ৬টি ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সুবিধা দিয়েছি। যার ফলে দেশব্যাপী ১০ গুণেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানিও হচ্ছে। যে ব্যান্ডউইথ এর দাম ২০০৭ সালে ছিল ৭৬ হাজার টাকা তা এখন ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে ই-গভর্নেন্স, ই-হেলথ, ই-কমার্স, ই-লার্নি, মোবাইল এপ্লিকেশনসহ ইন্টারনেটের বহুবিধ ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে।

আগামী কিছুদিনের মধ্যে ফোর জি প্রযুক্তি চালু কর করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য প্রযুক্তি খাতের বিকাশে উদ্ভাবন সক্ষমতা ও গবেষণার কোন বিকল্প। তিনি বলেন, এ জন্য আইসিটি বিভাগের আওতায় গবেষণা ফেলোশীপ, বৃত্তি প্রদান এবং উদ্ভাবন কাজের জন্য অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ‘ইনোভেশন ডিজাইন এন্ড এন্টারপ্রেনারশীপ একাডেমী’ স্থাপন এবং গড়ে তোলা হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’।
তিনি বলেন, উদ্যোক্তাদের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ঋণসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এর উদ্যোগে ‘ইই ফান্ড’র ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

আমাদের তরুণদের সক্ষমতা আজ বিশ্বজুড়ে নজরও কাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের মত উন্নত দেশের ১০ হাজার এপার্টমেন্টকে স্মার্ট করার কাজটা তাঁরা আমাদের তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছে। তারা এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
এই খাতটিকে আরো যোগ্য করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের তৈরি সফ্টওয়্যার ও আইটি সেবা আমরা সরবরাহ করছি। বেসরকারিখাতের প্রতিষ্ঠানকেও আমরা সহযোগিতা করছি। আমাদের কোম্পানিগুলো এখন আফ্রিকাতেও পদচারণা করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রথম দিনের আয়োজনে যা ছিল:
এক. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা বৃদ্ধি:
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ব্যবসার প্রচারণার নতুন হাতিয়ার এই ফেসবুক। এই মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা দাঁড় করানোর নানা কৌশল নিয়ে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্রো ইয়োর বিজনেস ইউজিং ফেসবুক’ নামে একটি সেমিনার। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রথম দিন সেমিনারটি দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু করে সাড়ে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফেসবুক ব্যবহার করে কীভাবে ব্যবসার প্রসার করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা হয় । এ ছাড়া বর্তমানে যারা ফেসবুক ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন, তারা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তা এতে তুলে ধরা হয়। এই আয়োজনে স্পিকার হিসেবে ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ড্রিম৭১ বাংলাদেশের পরিচালক রাশেদ কবির, ই-ক্যাবের পরিচালক নাসিমা আক্তার নিশো ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল, আইসিটি বিভাগের  প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব হারুনুর রশিদ।

দুই. গেইমিং ক্যারিয়ারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ:
ডেস্কটপ ও স্মার্টফোন উভয় ক্ষেত্রে গেইমিং বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশে এই খাতটি মাত্র শুরু হয়েছে এবং এর পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। গেইমিং নিয়ে ‘ক্যারিয়ার ইন গেইমিং ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রথম দিনে। সেমিনারটি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রেটি হলে বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠিত হয়ে, চলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত। এতে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাংরি বার্ডসের গেইম উন্নয়ন কর্মকর্তা লরি লুকা। বর্তমান বাজারে কোন ধরনের গেইমের চাহিদা বেশি এবং কেমন গেম বানালে তা ভালো হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। গেইমিং শিল্পে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার এবং মোবাইল অ্যাপ ও গেইম মনিটাইজেশনের সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয় এতে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ডেভেলপাররাও এতে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের অ্যাপ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগে। তাই তো মোবাইল অ্যাপের একটি বড় বাজার রয়েছে। এই বাজার সর্ম্পকে ধারণা ও নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে আলোচকরা।  স্পিকার হিসেবে ছিলেন রাইজ আপ ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এরশাদুল হক, স্পিনওফ স্টুডিওয়ের প্রধান নিবার্হী আসাদুজ্জামান আসাদ, ড্রিম৭১ বাংলাদেশের প্রধান নিবার্হী রাশেদ কবিরসহ আরও অনেকেই।

তিন.  পেমেন্ট সার্ভিস বিষয়ে সেমিনার:
ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রথম দিনে ‘পেইমেন্ট সার্ভিস অপরচুনিটি : সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনার চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় সেলিব্রেটি হলে। সেমিনারে বাংলাদেশে পেমেন্ট সার্ভিসেস ইকোসিস্টেমের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। এছাড়া  বাংলাদেশের পেমেন্ট সার্ভিসেসের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এতে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, এসএসএল ওয়্যারলেসের ই-কর্মাস বিভাগের প্রধান ন্যাওয়াট আস্কিন, মাস্টার কার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সাইদ এম কামাল, বিকাশের প্রধান নির্বাহী কামাল কাদীর ও ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমালসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

চার.  রোবট সোফিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ:
বিশ্বজুড়ে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট সোফিয়াকে নিয়ে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের দ্বিতীয় দিনের আয়োজন। ‘টেক টক উইথ সোফিয়া’ আয়োজনে দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিলো চোখে পড়ার মতো। সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেইমে বেলা আড়াইটা হতে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন সোফিয়া। যথা সময়ে মঞ্চে সোফিয়াকে এনে হাজির করা হয়। সঙ্গে ছিলেন সোফিয়ার উদ্ভাবক ডেভিড হ্যানসন।

বিজ্ঞাপনী সংস্থা গ্রে ঢাকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাউছুল আলম শাওনের সঞ্চালনায় ‘টেক টক উইথ সোফিয়া’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও উপস্থিত ছিলেন। প্রথমেই সঞ্চালক সোফিয়াকে বাংলাদেশের আসার জন্য অভিনন্দন জানান। জবাবে সোফিয়া বাংলাদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলে, ‘হ্যালো বাংলাদেশ। আই অ্যাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট ইন্ট্রিগ্রেটেড রোবট সোফিয়া।’

শাওন সোফিয়ার কাছে ইংরেজিতে জানতে চান, ‘সোফিয়া আপনি কী জানেন, এখন কোথায় আছেন?’ জবাবে সোফিয়া জানাল, ‘আমি বাংলাদেশে আছি। এখানে আজ থেকে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড শুরু হয়েছে। আমার সামনে হাজারো তরুণ আমার কথা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।’

এবার সঞ্চালক সোফিয়ার পরনের পোশাকের তারিফ করেন। বলেন, ‘সোফিয়া আপনি যে পোশাকটি পরেছেন তাতে আপনাকে মানিয়েছে বেশ। আপনি কি জানেন, আপনি কী পোশাক পরে আছেন?’ প্রশংসায় কে না খুশি হয়! রোবট হলেও সেও তো বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। তাই খানিকটা হেসে বলল, ‘আমি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানির তৈরি পোশাক পরেছি। এই জামদানি মিহি সুতার তৈরি। আরামদায়ক এই পোশাকটি পরে আমারও ভালো লাগছে।’

এরপর আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সোফিয়ার কাছে জানতে চান, একটি জাতিকে বদলানোর জন্য ডিজিটালাইজেশনের ভূমিকা কী হতে পারে? সব জান্তা রোবট সোফিয়া বলল, ‘একটি জাতিকে বদলাতে হলে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নাই।’ বাংলাদেশও সোফিয়ার মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট তৈরি করতে সক্ষম বলে মন্তব্য করে সোফিয়া।

এরপর সোফিয়ার উদ্ভাবক ড. ডেভিড হ্যানসন সোফিয়ার মতো অত্যাধুনিক তৈরি গল্প বললেন। জানালেন, ছোটবেলা থেকে তিনি রোবট তৈরির স্বপ্ন দেখতেন। তার বিশ্বাস এক সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট মানুষের হয়ে কাজ করবে। তিনি বাংলাদেশিদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা চাইলে সোফিয়ার সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন। কেননা এই সফটওয়্যার ওপেন সোর্সে আছে।

অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে রোবট সোফিয়া ও এর উদ্ভাবককে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্মননা জানানোর মধ্য দিয়ে।

পাঁচ. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: চ্যাটবট ও  ই-গভর্নেন্স লিভারেজিং শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় গ্রিন ভিউ হলে। আয়োজনটি শুরু হয় দুপুর আড়াইটা থেকে। সেমিনারে এআই নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেমিনারে এআই এবং এর ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে স্পিকার হিসেবে ছিলেন রিভ সিস্টেমের হেড অব সেলস তৌহিদুর রহমান, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা নূর নবী সিদ্দিক ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নিবার্হী রেজাউল হাসানসহ আরও অনেকে।

দ্বিতীয় দিনের আয়োজন: দ্বিতীয় দিনের ১২টি সেশনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেশনগুলো হলো- হাই স্কুল প্রোগ্রামার কনফারেন্স, মিট নাফিস বিন জাফর, স্টার্টআপ বাংলাদেশ, অপরচুনিটি ফর ইনভেস্টরস অ্যান্ড স্টার্টআপস, সাইবার সিকিউরিটি রিস্কস, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইথিক্যাল হ্যাকিং, এমপ্লয়মেন্ট অব পারসনস নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজ ইন দ্য আইটি ইন্ডাস্ট্রি।

নানা আয়োজনে ৪ দিনব্যাপী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড চলবে ৯ ডিসেম্বর শনিবার পর্যন্ত। প্রতিদিন মেলা চলবে সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে কোনো প্রবেশ ফি নেই। তবে এতে যেতে চাইলে www.digitalworld.org.bd এ ঠিকানায় গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। মেলা প্রাঙ্গণেও রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।

আপনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, প্রধানমন্ত্রীকে সোফিয়া

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা পর্ব শেষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশ্বের প্রথম রোবট ‘সোফিয়া’র সঙ্গে কথোপকথনের পর ট্যাব চেপে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক এ মেগা ইভেন্ট উদ্বোধন করেন।

‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’র উদ্বোধন ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে ওঠার পর ডাকা হয় যন্ত্রমানবী ‘সোফিয়াকে’। হলুদ জামদানির টপ ও স্কার্ট পরা ‘সোফিয়া’ মঞ্চে আসার পর দুজনের মধ্যে ইংরেজিতে কথোপকথন হয়।

সোফিয়া কেমন আছে—প্রথমে জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। জবাবে যন্ত্রমানবী সোফিয়া বলে, ‘ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি ভালো আছি। আমি গর্বিত। আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া দারুণ ব্যাপার।’

এরপর ‘তুমি আমাকে কীভাবে চিনলে—প্রধানমন্ত্রীর এ প্রশ্নের জবাবে ‘সোফিয়া’ বলে, ‘আমি জানি, আপনি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। আপনি মাদার অব হিউম্যানিটি ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। আপনার নাতনির নামও সোফিয়া।’

প্রধানমন্ত্রী তখন উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা জানেন, জয়ের (সজীব ওয়াজেদ জয়) মেয়ের নাম সোফিয়া।’

প্রধানমন্ত্রী ও হলিউডের প্রখ্যাত অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের আদলে গড়া যন্ত্রমানবী সোফিয়ার কথোপকথনের পর অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য লেজার শো।

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সভাপতি মোস্তফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের কূটনিতিকবৃন্দ, মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং কম্পিউটার খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

চার দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে—’রেডি ফর টুমরো’। ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।

‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে’ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবন ও অর্জন তুলে ধরা হবে। গেমিং সম্মেলন, ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসা বৃদ্ধি, ই-কমার্স সম্প্রসারণ বিষয়ক সেমিনারসহ মেলায় প্রতিদিন অনুষ্ঠেয় বিভিন্ন সেমিনারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন।

তথ্যপ্রযুক্তির এ মেগা ইভেন্টে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগবে না, তবে ওয়েবসাইটে (www.digitalworld.org.bd) নিবন্ধন করতে হবে। মেলা প্রাঙ্গণেও রয়েছে নিবন্ধনের সুযোগ।

Pin It