কেউ খাদ্য সংকটে পড়বে না: প্রধানমন্ত্রী

base_1500232663-3

বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪২১ ও ১৪২২ প্রদান অনুষ্ঠানে গতকাল এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ পুরস্কার বিতরণ করেন তিনি। দেশের কৃষি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১০টি শ্রেণীতে পাঁচটি স্বর্ণ, নয়টি রৌপ্য ও ১৮টি ব্রোঞ্জ পদক প্রদান করা হয়। খবর বাসস ও ইউএনবি।

অনুষ্ঠানে সরকারি তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি, বেসরকারি, মিল ও কৃষক পর্যায়ে সারা দেশে এক কোটি টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। মজুদ শক্তিশালী করতে আরো খাদ্যশস্য আমরা আমদানি করছি। বিভিন্ন দেশ থেকে নগদ অর্থে এ খাদ্যশস্য আমদানি করা হচ্ছে। বন্যার কারণে কাউকে যাতে খাদ্য সংকটে পড়তে না হয়, সেজন্য সরকার এসব করছে। এছাড়া চাল আমদানি উৎসাহিত করতে শুল্কহার ২৮ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

কৃষি খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সঠিক সময়ে যথাযথ গবেষণালব্ধ উদ্যোগ গ্রহণে সক্ষম হওয়ায় দেশে দুধ, মাংস ও ফলের উৎপাদন বেড়েছে। ভেড়ার পশমের সঙ্গে পাটের সুতার মিশ্রণে উৎপন্ন বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর জন্য বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ ইনস্টিটিউটকে (বিএলআরআই) ধন্যবাদ জানাই। তারাই গবেষণা করে এটা বের করেছে। কম্বল থেকে শুরু করে নানা সাংসারিক জিনিসপত্র এমনকি স্যুটের কাপড় পর্যন্ত তারা তৈরি করতে পারছে। তাদেরকে এখন সুযোগ দিতে হবে এগুলো ভালোভাবে বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতের।

শুধু দানাদার ফসল নয় আলু, সবজি, ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মাটি এত উর্বর যে, যেকোনো একটা কিছুর উদ্যোগ নিলেই কিন্তু সেটা উৎপাদন করতে পারি। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। আলু আমরা রফতানিও করছি। উদ্বৃত্ত আলু রফতানি ও শিল্প খাতে ব্যবহারে আমরা ২০ শতাংশ হারে সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাতের ফল উৎপাদনও করা হচ্ছে। স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, আঙ্গুর, মাশরুম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফল আমরা উৎপাদন করছি।

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনে আমাদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, পাট হচ্ছে পরিবেশবান্ধব কৃষিপণ্য। বর্তমানে দেশে-বিদেশে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা এবং রফতানি বাড়ছে। পাটের সে সুদিন আবার ফিরে এসেছে।

শ্রমের মজুরি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে একজন দিনমজুর যা আয় করত, তা দিয়ে একবেলার খাবারও কিনতে পারত না। এখন একদিনের মজুরিতে ১০-১২ কেজি চাল কেনা যায়।

পানির অপচয় যাতে না হয়, সেদিকে নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ রাখতে হবে যে, ভৌগোলিক অবস্থানে বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ। এজন্য আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সেচ সম্প্রসারণের পাশাপাশি পানির ব্যবহার সীমিত রাখার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে পানির অপচয় না হয়। কৃষি তথ্যকেন্দ্র থেকে এখন কোন জমিতে কতটুকু পানি প্রয়োজন, সে তথ্যও সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় তার সরকারের প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো প্রভাব আমাদের দেশে যেন না পড়তে পারে, দেশের মানুষের জীবন যেন কোনো রকম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। এ ব্যাপারে দেশবাসীকেও সচেতন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের জলাভূমিগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। এ জলাভূমি নদী, নালা, খাল, বিল, হাওড়, বাঁওড়— এ সবই আমাদের সম্পদ। এগুলো আমাদের সুপেয় পানির চাহিদা যেমন মেটায়, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ঠিক রাখে।

শহরের গণ্ডির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের কৃষিকাজের বিষয়ে সম্যক ধারণা দেয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েরা অন্ধ (বাস্তবতাবিবর্জিত) হয়ে যেন না থাকে, সে বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি দিতে হবে। ধান কাটা বা লাগানো হয়, এমন মৌসুমে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই গ্রামে ধানক্ষেতের পাশে নিয়ে যাওয়া উচিত। ছোটবেলা থেকেই তাদের বোঝানো উচিত দেশটা কীভাবে চলছে, খাদ্য কীভাবে আসছে। আজকাল শহরে যেসব ছেলেমেয়ে বড় হয়, তাদের অনেকে এসব সম্পর্কে জানতেও পারে না। জানি না একদিন হয়তো তারা প্রশ্ন করবে, ধানগাছে তক্তা হয় কি না।

দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক বিশ্বের অনেক ছেলেমেয়েকে কোনো ফল খাওয়া অবস্থায় ফলটা কোথায় পাওয়া যায়— জিজ্ঞেস করলে, সে বলবে সুপার মার্কেটে পাওয়া যায়। কোথায় উৎপাদন হয়েছে, এ বিষয়টিই তার মাথায় নেই।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। স্বাগত বক্তব্য ও পুরস্কার বিতরণ পর্ব সঞ্চালনা করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মইনুদ্দিন আব্দুল্লাহ। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশী কূটনীতিক এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

Pin It